খুচরা সার বিক্রেতাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি
১। সার বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে সরকারের নতুন নীতিমালা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে আলোচনা ও উদ্বেগ।
২। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত খুচরা বিক্রেতারা নতুন ব্যবস্থায় নিজেদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন।
৩। ব্যবসায়ীদের দাবি, সারাদেশে প্রায় ৪৪ হাজার কার্ডধারী খুচরা সার বিক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে কৃষকদের সেবা দিয়ে আসছেন।
৪। তাদের ভাষ্য, এই ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক পরিবার ও শ্রমজীবী মানুষ যুক্ত।
৫। ২০২৫ সালের সমন্বিত সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ নীতিমালায় সার বিতরণ ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
৬। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সমন্বিত নীতিমালাটি ১৩ নভেম্বর ২০২৫ প্রকাশ করা হয়।
৭। নীতিমালায় অনিয়ন্ত্রিত সাব-ডিলার বা খুচরা সার বিক্রেতা ব্যবস্থা রহিত করার কথা বলা হয়েছে।
৮। বিদ্যমান সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের দায়-দেনা নিষ্পত্তির জন্য ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল।
৯। এরপর ডিলারদের নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সার বিক্রির সুযোগ না রাখার বিধান করা হয়।
১০। সরকারের পক্ষ থেকে এর অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে সার বিতরণে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
১১। তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন কাঠামোয় তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসা ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
১২। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ ও নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগ করে সার ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে বিভিন্ন কর্মসূচিতে জানিয়েছেন।
১৩। তাদের আরও দাবি, কৃষকের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে অনেক সময় বাকিতে সার সরবরাহ করেও তারা কৃষি উৎপাদনে সহায়তা করেছেন।
১৪। ফলে হঠাৎ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে বিনিয়োগ ও কৃষকদের কাছে থাকা বকেয়া টাকা আদায় নিয়েও জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
১৫। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে খুচরা সার বিক্রেতারা মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দিয়ে আগের ব্যবস্থা বহালের দাবি জানিয়েছেন।
১৬। তাদের অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থায় প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা তৈরি হতে পারে।
১৭। অন্যদিকে সরকার নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণকে আরও নিয়ন্ত্রিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
১৮। সাম্প্রতিক সংশোধিত নীতিমালায় প্রতিটি উপজেলায় ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার বিতরণের জন্য ন্যূনতম ৯ জন ডিলার রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৯। একজন ডিলারের অধীনে সর্বোচ্চ তিনটি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র রাখার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
২০। এর মধ্যে একটি কেন্দ্র ডিলার নিজে পরিচালনা করবেন এবং অন্য দুটি মনোনীত বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
২১। নতুন ডিলারদের নিজস্ব বা ভাড়ায় নেওয়া কমপক্ষে ৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকার শর্তও রাখা হয়েছে।
২২। ডিলার হতে আবেদনকারীর কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা ব্যাংক সক্ষমতার সনদ এবং নির্ধারিত অন্যান্য যোগ্যতা থাকার বিধান রয়েছে।
২৩। নির্বাচিত ডিলারকে ৩ লাখ টাকা জামানত দেওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছে; বিক্রয় প্রতিনিধির জামানত নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।
২৪। একই ব্যক্তি একাধিক ডিলারশিপ নিতে পারবেন না এবং একই পরিবারের একাধিক সদস্যের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।
২৫। পাশাপাশি সার বিতরণে অনিয়ম হলে তদন্তের মাধ্যমে ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
২৬। সরকারের যুক্তি, শক্তিশালী মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সময়মতো ও ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
২৭। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, নীতিমালা বাস্তবায়নের আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, পুরোনো ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও কৃষকের সুবিধা বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২৮। তাদের দাবি, ৪৪ হাজার কার্ডধারী খুচরা বিক্রেতার পাশাপাশি আরও বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই বাজারের সঙ্গে যুক্ত।
২৯। তাই কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা রক্ষায় নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি জোরালো হচ্ছে।
৩০। এখন প্রশ্ন—নতুন ডিলারভিত্তিক কাঠামো কতটা কার্যকর হয় এবং কৃষক ও দীর্ঘদিনের খুচরা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ কীভাবে সমন্বয় করা হয়, সেটিই দেখার বিষয়।
