সার নীতিমালা ২০২৫: কৃষকবান্ধবতার বদলে বাড়ছে প্রান্তিক কৃষকের ভোগান্তি
ডেস্ক রিপোর্ট, টাইমস বাংলা নিউজ বিডি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬
সার বিতরণে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে সার নীতিমালা ২০২৫ চালু হলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের সাধারণ ও প্রান্তিক কৃষকেরা। কৃষকদের অভিযোগ, নতুন এই নীতিমালার বাস্তবায়ন পদ্ধতি তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে কৃষকবান্ধব হওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই এটি প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বাড়তি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের নিম্ন ও প্রান্তিক শ্রেণির কৃষকদের বড় একটি অংশ নগদ অর্থের সংকটে চাষাবাদ পরিচালনা করেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় খুচরা সার বিক্রেতাদের কাছ থেকে বাকিতে সার সংগ্রহ করে জমিতে ব্যবহার করেন। পরে ফসল বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে সার বিক্রেতাদের দেনা পরিশোধ করেন। এই পদ্ধতির মাধ্যমে নগদ অর্থ না থাকলেও কৃষকেরা সময়মতো চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারতেন।
কিন্তু সার নীতিমালা ২০২৫ বাস্তবায়নের পর সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ কৃষকদের। প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার নগদ অর্থ দিয়ে কেনার সক্ষমতা না থাকায় অনেক কৃষক চাহিদা অনুযায়ী সার সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে জমিতে প্রয়োজনীয় সময়ে সার প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে যারা নগদ টাকা নিয়ে সার কিনতে যাচ্ছেন, তারাও চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, ১০ বস্তা সার প্রয়োজন হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ১ বস্তা সার দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষকের সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে জমির প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা।
সার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টিও কৃষকদের অন্যতম বড় অভিযোগ। একটি ওয়ার্ডে একটি বিক্রয়কেন্দ্র থাকায় অনেক এলাকায় একই কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যক কৃষকের চাপ তৈরি হচ্ছে। সকাল থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের মতে, একজন প্রান্তিক কৃষকের জন্য দিনের কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শুধু সময়ের অপচয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাড়তি আর্থিক ক্ষতি। অনেক কৃষক দিনমজুরি কিংবা অন্যান্য কাজ ছেড়ে সার সংগ্রহ করতে আসেন। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে তাদের কৃষিকাজও ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার প্রয়োজনীয়তা তারা অস্বীকার করছেন না। তবে সেই শৃঙ্খলা যেন কৃষকের বাস্তব সমস্যা ও আর্থিক সক্ষমতাকে উপেক্ষা করে না হয়, সেটিই তাদের দাবি। তাদের মতে, পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত না করে শুধু বিতরণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনলে সংকটের সমাধান হবে না।
মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বিপুল সংখ্যক সাধারণ কৃষক সার নীতিমালা ২০২৫ নিয়ে অসন্তুষ্ট। কৃষকদের দাবি, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রান্তিক কৃষকের আয়, নগদ অর্থের সংকট এবং স্থানীয় কৃষি বাস্তবতাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, কৃষিবান্ধব নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কৃষকের হাতে প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত সার পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি সহজ শর্তে সার কেনার সুযোগ, পর্যাপ্ত বিক্রয়কেন্দ্র এবং চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো পর্যাপ্ত সার না পেলে শুধু উৎপাদন ব্যাহত হবে না, বরং কৃষকের উৎপাদন খরচও বাড়বে। এতে ফসলের ফলন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এ অবস্থায় সাধারণ কৃষকদের দাবি, সার নীতিমালা ২০২৫ মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করে পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। কৃষকের প্রয়োজন ও সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সার বিতরণ ব্যবস্থা সহজ করা, পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের ভাষায়, শৃঙ্খলাপূর্ণ সার বিতরণ অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই শৃঙ্খলা যদি কৃষকের জমিতে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছাতেই বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে তা কৃষকবান্ধব নীতিমালা হিসেবে কতটা কার্যকর—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।